পিরোজপুরের সাত উপজেলায় প্রায় ৪৮০ কিলোমিটার গ্রামীণ কাঁচা সড়ক পাকাকরণের জন্য নেওয়া ৬০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্পে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পের ৩১টি স্কিমে মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান কাজ না থাকার পরও প্রায় ৯১ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদন ও গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
নথিতে প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৭৭ শতাংশ দেখানো হলেও বিভিন্ন স্থানে বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সেই হিসাবের অসঙ্গতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি প্যাকেজে বাস্তব কাজের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি বিল পরিশোধের অভিযোগও সামনে এসেছে।
৬০০ কোটি টাকার প্রকল্পের লক্ষ্য কী ছিল
উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনার (ডিপিপি) তথ্য অনুযায়ী, পিরোজপুর জেলায় নিবন্ধিত গ্রামীণ সড়কের দৈর্ঘ্য প্রায় ৫ হাজার ৮১৯ কিলোমিটার। এর মধ্যে প্রায় ৪ হাজার ৪৭৪ কিলোমিটার সড়ক কাঁচা।
গ্রামীণ যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করতে জেলার সদর, নাজিরপুর, নেছারাবাদ, ভান্ডারিয়া, কাউখালী, ইন্দুরকানি ও মঠবাড়িয়া উপজেলায় মোট ৪৭৯ দশমিক ৬২ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক পাকাকরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
গ্রামের মানুষের বাজার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াত সহজ করার পাশাপাশি স্থানীয় কর্মসংস্থান তৈরিও ছিল প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটি ২০২১ সালের ১৬ মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদন পায়। প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ ছিল ২০২১ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত।
৩১ স্কিমে কাজ ছাড়াই অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ
অনুসন্ধানে অভিযোগ উঠেছে, প্রকল্পের আওতায় ৩১টি স্কিম বা প্যাকেজে বাস্তবে প্রত্যাশিত নির্মাণকাজ না হলেও প্রায় ৯১ কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
এ ছাড়া ৪৭টি প্যাকেজে বাস্তব কাজের অগ্রগতির তুলনায় তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বেশি বিল পরিশোধের অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়েছে কি না, তা প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়নি।
কোথাও রাস্তা নেই, কোথাও কালভার্টের অস্তিত্ব মেলেনি
ডিপিপি অনুযায়ী, ভান্ডারিয়া মহিলা কলেজ থেকে পূর্ব ভান্ডারিয়া মন্ত্রিবাড়ি সড়ক হয়ে খন্দকার বাড়ি সড়কে বিটুমিনাস কার্পেটিং (বিসি) রাস্তা এবং তিনটি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল।
কিন্তু সরেজমিন অনুসন্ধানে সেখানে পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। অথচ এই কাজের বিপরীতে প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে।
একইভাবে শ্রীপুর শিকদার হাট থেকে শ্রীপুর বলগার ব্রিজ সড়কে বিসি রাস্তা এবং কয়েকটি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণের কথা থাকলেও সংশ্লিষ্ট রাস্তা কাঁচা অবস্থায় থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে পরিকল্পিত কালভার্টও নির্মিত হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে। এই খাতে প্রায় ৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
আরও কয়েকটি প্রকল্পেও একই ধরনের অভিযোগ
মাটিভাঙ্গা-কাঠালিয়া বর্ডার সড়কে বিসি রাস্তা এবং ১২টি আরসিসি বক্স কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও অনুসন্ধানে এসব কাজের অস্তিত্ব না পাওয়ার দাবি করা হয়েছে। অথচ সংশ্লিষ্ট কাজের বিপরীতে প্রায় ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে।
রাজপাশা স্টিল ব্রিজ থেকে মহিলা দাখিল মাদ্রাসা সড়ক এবং ধাওয়া সড়ক থেকে পোদ্দার খাল সড়কে বিসি রাস্তা ও ১০টি বক্স কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। সেখানে কিছু ইটের খোয়া ফেলার পর কাজ আর এগোয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এরপরও প্রায় ৩ কোটি ২১ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১২৮ কোটি টাকার বেশি অডিট আপত্তির তথ্য
প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, উপজেলা প্রকৌশল দপ্তরের মেজারমেন্ট বুক ও প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ছাড়াই কোনো কোনো বিল অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
ডিপিপির বাইরে বরাদ্দ, বিল পরিশোধ এবং কেনাকাটাসংক্রান্ত বিভিন্ন অনিয়মের কারণে প্রায় ১২৮ কোটি ৫২ লাখ টাকার অডিট আপত্তি ওঠার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, ঠিকাদার ও প্রতিষ্ঠানের পৃথক বক্তব্য এবং চলমান তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।
দুর্ভোগের কথা বলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা
প্রকল্প এলাকার একাধিক বাসিন্দা জানিয়েছেন, নথিতে উন্নয়নকাজ দেখানো হলেও তাদের অনেক সড়কের অবস্থার দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কোনো কোনো সড়কে সামান্য ইট বা খোয়া ফেলার পর দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ রয়েছে। বর্ষায় এসব রাস্তা কাদায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। এতে শিক্ষার্থী, রোগীসহ সাধারণ মানুষকে প্রতিদিন ভোগান্তির মুখে পড়তে হচ্ছে।
কয়েকটি এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের অর্থ সংগ্রহ করে ইট ও বালি দিয়ে সাময়িকভাবে রাস্তা চলাচলের উপযোগী করার চেষ্টা করেছেন বলেও জানা গেছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে কাজ বন্ধ বা অসম্পূর্ণ থাকলেও নিয়মিত তদারকি চোখে পড়েনি।
দুদকের মামলার কথাও উঠে এসেছে
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্প ঘিরে অনিয়মের বিভিন্ন অভিযোগে সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকজনকে নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একাধিক মামলা চলমান রয়েছে।
একই সঙ্গে আইনি জটিলতার কারণে বন্ধ থাকা অসমাপ্ত কাজগুলো নতুন দরপত্রের মাধ্যমে আবার চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
প্রকল্পে অর্থ আত্মসাৎ বা জালিয়াতির যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলোর চূড়ান্ত দায় নির্ধারণ সংশ্লিষ্ট তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
