সড়ক দুর্ঘটনাকে হামলা দেখিয়ে মামলা করার অভিযোগ ছাত্রদল নেতার বিরুদ্ধে

সারাদেশ

শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার চাকধ বাজার এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত আক্তার মাঝিকে (৬০) মারধর করা হয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা করার অভিযোগ উঠেছে সখিপুর থানা ছাত্রদলের সহসভাপতি জিয়াউর রহমান টিপু মাঝির বিরুদ্ধে। মামলাটিতে গ্রেপ্তার হয়ে কাশেম মাঝি (৬৫) নামে এক ব্যক্তি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।

তবে মামলার বাদী টিপু মাঝি দাবি করেছেন, এজাহারে তিনি যে ঘটনা উল্লেখ করেছেন তা সত্য। অন্যদিকে পুলিশ জানিয়েছে, অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা নেওয়া হয়েছে এবং তদন্তে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে এলে সে অনুযায়ী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, উত্তর তারাবুনিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আক্তার মাঝি মোটরসাইকেলে যাত্রী পরিবহন করে জীবিকা নির্বাহ করেন। গত ৩১ আগস্ট যাত্রী নিয়ে যাওয়ার সময় নড়িয়া উপজেলার চাকধ বাজার এলাকায় বালুবাহী একটি ট্রলির সঙ্গে তার মোটরসাইকেলের সংঘর্ষ হয়। এতে আক্তার মাঝিসহ মোটরসাইকেলে থাকা আরেক ব্যক্তি আহত হন।

স্থানীয়রা তাদের উদ্ধার করে নড়িয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর চিকিৎসক আক্তার মাঝিকে উন্নত চিকিৎসার জন্য শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। তবে পরে স্বজন ও পরিচিতরা তাকে চাঁদপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান।

এরপর আক্তার মাঝির চাচাতো ভাই ও সখিপুর থানা ছাত্রদলের সহসভাপতি জিয়াউর রহমান টিপু মাঝি সখিপুর থানায় একটি মামলা করেন। মামলায় পারিবারিক শত্রুতার জেরে আক্তার মাঝিকে মারধরের অভিযোগ এনে হযরত আলী মামুন ও কাশেম মাঝিসহ পাঁচজনের নাম উল্লেখ এবং অজ্ঞাত আরও চার-পাঁচজনকে আসামি করা হয়। মামলার ঘটনাস্থল হিসেবে সখিপুর-ভেদরগঞ্জ সড়কের ডিএমখালি চরচান্দা বাজার উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলা নথিভুক্ত হওয়ার পর পুলিশ কাশেম মাঝিকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করা সবুজ মিয়া বলেন, ৩১ আগস্ট বিকট শব্দ শুনে ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি মোটরসাইকেল ও বালুবাহী ট্রলির দুর্ঘটনা দেখতে পান। পরে কয়েকজনের সহযোগিতায় আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসক আক্তার মাঝিকে সদর হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিলেও পরে তাকে চাঁদপুরে নেওয়া হয় বলে জানান তিনি।

বালুবাহী ট্রলির মালিক বাদশা বেপারিও দাবি করেন, তার ট্রলির সঙ্গে আক্তার মাঝির মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছিল। দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে দুর্ঘটনাকবলিত মোটরসাইকেলটি মেরামত করে রাখা হয় এবং কয়েক দিন পর টিপু মাঝি সেটি নিয়ে যান বলে জানান তিনি।

আক্তার মাঝিকে চাঁদপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া মো. বাহাউদ্দীনও ঘটনাটিকে সড়ক দুর্ঘটনা বলে দাবি করেন। তার ভাষ্য, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে তিনি আরও দুজন চালককে সঙ্গে নিয়ে হাসপাতালে যান। পরে টিপু মাঝির পরামর্শে আক্তার মাঝিকে চাঁদপুরে নিয়ে ভর্তি করা হয়। পরবর্তী সময়ে ঘটনাটি মারধরের মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হওয়ার খবর শুনে তিনি বিস্মিত হন বলে জানান।

আরেক প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করা আবুল হাসেম বলেন, বিকট শব্দ শুনে এগিয়ে গিয়ে তিনি দুজনকে সড়কে পড়ে থাকতে এবং মোটরসাইকেলটি গাছের সঙ্গে আটকে থাকতে দেখেন। পরে অন্যদের সঙ্গে আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যান।

গ্রেপ্তার কাশেম মাঝির ছেলে ইমরান মাঝির অভিযোগ, দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধের জেরে তার বাবাকে মামলায় জড়ানো হয়েছে। তার দাবি, দুর্ঘটনাটি নড়িয়া উপজেলায় ঘটলেও মামলায় ঘটনাস্থল ভেদরগঞ্জ উপজেলার ডিএমখালি দেখানো হয়েছে। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন এবং তার বাবার মুক্তির দাবি জানান তিনি।

এ বিষয়ে আক্তার মাঝির স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরবর্তী সময়ে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে মামলার বাদী জিয়াউর রহমান টিপু মাঝি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, মামলার আসামিরা এর আগেও তাকে মামলা ও হামলার মাধ্যমে হয়রানি করেছেন। মামলার এজাহারে তিনি যা উল্লেখ করেছেন, তা সত্য বলে দাবি করেন। প্রয়োজনীয় প্রমাণ সরাসরি সাক্ষাতে দেখাবেন বলেও জানান তিনি।

সখিপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোফাজ্জল হুসাইন বলেন, বাদীপক্ষের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা রুজু করা হয়েছে। তদন্ত শেষে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্তে কেউ মিথ্যা মামলার শিকার হয়েছেন বলে প্রমাণিত হলে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।