বিএনপি ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা একাট্টা হয়ে লুট করছে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি সুনামগঞ্জের তাহিরপুরের যাদুকাটা নদীর বালু-পাথর। সনাতন পদ্ধতি বালু তোলার পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে পরিবেশ ধ্বংসকারী ড্রেজার ও শ্যালো মেশিন। ইজারার মেয়াদ শেষ হলেও বালু-পাথর তোলা অব্যাহত থাকায় সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব হারাচ্ছে। পাশাপাশি হুমকিতে পড়েছে যাদুকাটার জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ।
পুলিশের বিশেষ শাখার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। ‘অতি গোপনীয়’ ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়, সুনামগঞ্জের তিন সংসদ সদস্য কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মিলেমিশে বালু মহাল থেকে পাথর লুট করছেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের মেঘালয় থেকে আসা বালি ও পাথরের কারণে নদীটি সম্পদশালী ও গুরুত্বপূর্ণ। এ নদীর অববাহিকায় অবস্থিত রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওর। নদীটির সবুজাভ স্বচ্ছ পানি পর্যটকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। এ নদী থেকে প্রতি বছর প্রায় পাঁচ কোটি ঘনফুট বালি, এক কোটি ঘনফুট নুড়ি, বোল্ডার ও ভাঙা পাথর আহরণ করে দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হয়ে থাকে। নদীটিতে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৩০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন। এর মধ্যে ১৫ হাজার বারকি শ্রমিক। ড্রেজার ও যন্ত্রচালিত শক্তিশালী সেভ মেশিন ব্যবহারের কারণে হুমকিতে পাড়েছে বারকি শ্রমিকদের জীবন-জীবিকা। ড্রেজার ও অন্যান্য যন্ত্র দিয়ে তলদেশ থেকে বালু তোলার ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ ও আশপাশের পরিবেশে বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসন, পুলিশ ও কয়েকজন সাংবাদিকের অসাধু সিন্ডিকেট এ বালু উত্তোলনে জড়িত। অবাধে বালু তোলায় যাদুকাটা, ধোপাজান ও চেলা নদীর তীর, সড়ক, বসতবাড়ি, সরকারি খাসজমি ও হাওর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মাত্র দু-তিন কোটি টাকায় যাদুকাটা নদীর বালুমহাল ইজারা দেওয়া হতো। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যাদুকাটা নদীর ১ ও ২ নম্বর বালুমহাল বাংলা ১৪৩২ সালের জন্য ১০৭ কোটি টাকায় ইজারা দেওয়া হয়। এর মধ্যে যাদুকাটা-১ বালুমহালের ইজারা মূল্য ৩৭ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং যাদুকাটা-২ বালুমহাল ৬৮ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। ইজারার মেয়াদ ছিল পহেলা বৈশাখ ১৪৩২ থেকে ৩০ চৈত্র ১৪৩২ পর্যন্ত। গত মার্চে ইজারার মেয়াদ শেষ হয়। কিন্তু বালু-পাথর তোলা বন্ধ হয়নি।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সাত মাসের জন্য ইজারার মেয়াদ বাড়ানোর আবেদন জানিয়ে ইজারাদার নাছির মিয়া ও শাহ রুবেল আহমেদ হাইকোর্টে রিট করেন। এরপর ইজারার আড়ালে বালু উত্তোলন অব্যাহত রাখার অভিযোগ ওঠে। রিটের বিরুদ্ধে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে প্রয়োজনীয় আপিল বা আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এর মধ্যে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাকর্মীরা যোগসাজশ করে বালু উত্তোলন অব্যাহত রেখেছে। এতে সরকার ৩০০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব হারিয়েছে।
বিশেষ শাখার প্রতিবেদনে সুনামগঞ্জের তিন সংসদ সদস্য এবং আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট নেতার বিরুদ্ধে যাদুকাটা, ধোপাজান ও চেলা নদীর বালু-পাথর উত্তোলন করার নিয়ন্ত্রণের কথা বলা হয়েছে। তারা হলেন—সুনামগঞ্জ-১ আসনের কামরুজ্জামান কামরুল, সুনামগঞ্জ-৪ আসনের নুরুল ইসলাম নুরুল এবং সুনামগঞ্জ-৫ আসনের কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন। তাদের বিরুদ্ধে বালু ব্যবসা, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ করা হয়।
এতে উল্লেখ করা হয়, বাংলাদেশ স্থলবন্দর শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আজাদ হোসেন ওই তিন এমপির সঙ্গে মিলে মিশে বালু-পাথরের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। আজাদ তাহিরপুরের বালিজুরি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। তিনি সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলা মামলার আসামি। এছাড়া রাজধানীর পল্টন, রমনা ও মতিঝিল থানায় জুলাই বিপ্লবকেন্দ্রিক দায়ের হওয়া চারটি মামলার আসামি। এসব মামলায় তাকে আওয়ামী লীগের অর্থ জোগানদাতা বলা হয়েছে। এছাড়া জেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক খন্দকার মঞ্জুর হোসেন বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ রাখতে সংসদ সদস্য কামরুল ইসলামকে ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ি উপহার দিয়েছেন।
তথ্যসূত্রঃ আমারদেশ
