সৌদির কাছে এফ-৩৫ বিক্রিতে ট্রাম্পের অনুমোদন, সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে উদ্বেগ ইসরায়েলের
সৌদি আরবের কাছে অত্যাধুনিক এফ-৩৫ স্টেলথ যুদ্ধবিমান বিক্রির প্রস্তাব অনুমোদন দিয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। প্রায় ২ হাজার ৪৩০ কোটি ডলারের এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ইসরায়েলের পর মধ্যপ্রাচ্যের দ্বিতীয় দেশ হিসেবে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান পাবে সৌদি আরব। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব ও আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বজায় থাকা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানায়, সৌদি আরবের কাছে ৪৮টি এফ-৩৫ লাইটনিং টু যুদ্ধবিমান এবং ৪৯টি এফ১৩৫-পিডব্লিউ-১০০ ইঞ্জিন বিক্রির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। প্রস্তাবিত চুক্তিতে যুদ্ধবিমানের পাশাপাশি যোগাযোগব্যবস্থা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ ও কারিগরি সহায়তাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
তবে চুক্তিটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের পর্যালোচনা প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর এটি বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপ শুরু হতে পারে। সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও যুদ্ধবিমানগুলো সৌদি আরবের হাতে পৌঁছাতে কয়েক বছর সময় লাগতে পারে।
সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে ইসরায়েলের উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে একমাত্র ইসরায়েলের কাছেই এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান রয়েছে। উন্নত প্রযুক্তির এই যুদ্ধবিমান দেশটির বিমানবাহিনীর সামরিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মার্কিন আইনে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সামরিক সক্ষমতার গুণগত শ্রেষ্ঠত্ব বা ‘কোয়ালিটেটিভ মিলিটারি এজ’ বজায় রাখার নীতিগত বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে সৌদি আরবের কাছে একই ধরনের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান বিক্রির সিদ্ধান্ত ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও সামরিক অবস্থানের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট মহলে এই চুক্তি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে বলে দেশটির সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তির বিরোধিতা করেনি।
অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের দাবি, প্রস্তাবিত এই যুদ্ধবিমান বিক্রির ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক ভারসাম্যে কোনো পরিবর্তন আসবে না।
সৌদি-চীন সামরিক সম্পর্ক নিয়েও উদ্বেগ
সৌদি আরবের সঙ্গে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
বিশেষ করে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমানের সংবেদনশীল প্রযুক্তি ও সামরিক তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মার্কিন আইনপ্রণেতা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।
এর আগে চীনের সঙ্গে সামরিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্কের জটিলতার কারণে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে এফ-৩৫ বিক্রির পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। সৌদি আরবের ক্ষেত্রেও একই ধরনের নিরাপত্তা উদ্বেগ সামনে আসতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।
তবে এসব উদ্বেগের মধ্যেই রিয়াদের সঙ্গে প্রস্তাবিত অস্ত্র বিক্রির প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন।
ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টি কোথায়
সৌদি আরবের কাছে এফ-৩৫ বিক্রির সম্ভাবনা একসময় রিয়াদ ও তেল আবিবের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আলোচনার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারা সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিষয়টিকে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান বিক্রির শর্ত হিসেবে রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন।
কিন্তু নতুন প্রস্তাবিত চুক্তিতে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার কোনো পূর্বশর্ত রাখা হয়নি বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ইসরায়েলের সঙ্গে রিয়াদের সম্ভাব্য কূটনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি পৃথকভাবে এগোনোর সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ইয়েমেনে সংঘাতের মধ্যেই নতুন অস্ত্র চুক্তি
ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠীর সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ার মধ্যেই এফ-৩৫ বিক্রির সিদ্ধান্ত সামনে এলো।
সৌদি আরবের বিভিন্ন স্থাপনা ও লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ ঘিরে হুতিদের সামরিক তৎপরতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান সৌদি আরবের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াবে। পাশাপাশি মার্কিন বাহিনী ও আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে দেশটির সামরিক সমন্বয় আরও জোরদার হবে।
এর আগে ২০২৫ সালে সৌদি আরবের জন্য প্রায় ১৪ হাজার ২০০ কোটি ডলারের একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা প্যাকেজ ঘোষণা করেছিল ওয়াশিংটন। নতুন এফ-৩৫ বিক্রির প্রস্তাব দুই দেশের সামরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের আরেকটি পদক্ষেপ।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান
মার্কিন প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিনের তৈরি এফ-৩৫ একটি পঞ্চম প্রজন্মের বহুমুখী যুদ্ধবিমান। স্টেলথ প্রযুক্তির কারণে শত্রুপক্ষের রাডারে এর উপস্থিতি শনাক্ত করা তুলনামূলক কঠিন।
উন্নত সেন্সর, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা এবং বিভিন্ন ধরনের সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার সুবিধার কারণে আধুনিক বিমানযুদ্ধে এফ-৩৫ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সৌদি আরব এই যুদ্ধবিমান হাতে পেলে দেশটির বিমানবাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়বে। তবে এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক শক্তির ভারসাম্য কতটা পরিবর্তিত হবে, তা নির্ভর করবে যুদ্ধবিমানগুলোর সক্ষমতা, সরবরাহের সময়সীমা এবং সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সামরিক প্রস্তুতির ওপর।
আপাতত প্রস্তাবিত চুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের পর্যালোচনা ও পরবর্তী বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার ওপর।
