করোনা টিকার ৪০ হাজার কোটি টাকা

করোনা টিকার ৪০ হাজার কোটি টাকার ব্যয়ের নথি নিয়ে প্রশ্ন, ১২০০ কোটি টাকা ফেরত না পাওয়ার দাবি

জাতীয়

নিজস্ব প্রতিবেদক

করোনা মহামারির সময় টিকা কেনাকাটা ও টিকাদান কার্যক্রমে ব্যয় করা প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার হিসাবসংক্রান্ত নথিপত্র সংগ্রহে জটিলতার মুখে পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে একাধিকবার চিঠি দিয়েও প্রয়োজনীয় সব নথি পাওয়া যাচ্ছে না বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কর্মকর্তারা।

একই সঙ্গে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে করোনার টিকা কেনার জন্য অগ্রিম দেওয়া ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা ফেরত না পাওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও ওই অর্থ বাংলাদেশ ফেরত পায়নি।

টিকা কেনাকাটার নথি চেয়ে দুদকের চিঠি

করোনাকালীন টিকা কেনাকাটা, সরবরাহ ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনে অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক।

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে টিকা আমদানির তথ্য, আর্থিক বিবরণী, ব্যয়ের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের নথি চাওয়া হয়েছে।

দুদকের অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, একাধিকবার চিঠি পাঠানোর পরও প্রয়োজনীয় সব তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে অনুসন্ধানের অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছে।

তবে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুদকের অনুসন্ধানে সহযোগিতা করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় নথি সরবরাহের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কিছু নথি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাওয়া যাচ্ছে না বলেও জানিয়েছেন তাঁরা।

৪০ হাজার কোটি টাকার ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন

করোনা মহামারির সময় টিকা কেনা, সংরক্ষণ, পরিবহন ও টিকাদান কার্যক্রমসহ আনুষঙ্গিক খাতে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব দিয়েছিল তৎকালীন সরকার।

তবে ২০২২ সালে প্রকাশিত ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণায় টিকাদান কার্যক্রমের সম্ভাব্য ব্যয় নিরূপণ করা হয় প্রায় ১২ হাজার ৯৯৩ কোটি থেকে ১৬ হাজার ৭২১ কোটি টাকা।

সরকারের দেওয়া হিসাব ও টিআইবির প্রাক্কলনের মধ্যে বড় পার্থক্য থাকায় ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের দাবি জানায় সংস্থাটি।

অন্যদিকে তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক টিআইবির গবেষণার পদ্ধতি ও ফলাফল নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। তিনি টিকাদান কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন।

টিকা কেনাকাটা ও সংশ্লিষ্ট খাতে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও দুদকের অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে। তবে ব্যয়ের হিসাবের পার্থক্যই অর্থ আত্মসাতের চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে আর্থিক লেনদেন ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই প্রয়োজন।

ভারতের কাছে অগ্রিম ১২০০ কোটি টাকা ফেরত পাওয়ার দাবি

২০২১ সালের জানুয়ারিতে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনার টিকা কেনার জন্য ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করে বাংলাদেশ।

ওই চুক্তির আওতায় টিকা আমদানির এজেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড।

প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, টিকা কেনার জন্য অগ্রিম বাবদ দুই দফায় প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ভারতে করোনা পরিস্থিতির অবনতি হলে সেরাম ইনস্টিটিউট টিকা রপ্তানি বন্ধ করে দেয়।

টিকা সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অগ্রিম অর্থ ফেরত চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছিল বলে জানিয়েছিলেন তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল।

তবে ওই অর্থের সর্বশেষ নিষ্পত্তির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলো থেকে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

অনুসন্ধান এখনো চলমান

করোনাকালীন টিকা কেনাকাটা ও ব্যয়ে অনিয়মের অভিযোগে দুদকের অনুসন্ধান এখনো শেষ হয়নি।

দুদক চেয়ারম্যান বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, বিষয়টি অনুসন্ধানের পর্যায়ে রয়েছে। প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ ও সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর বিস্তারিত জানানো সম্ভব হবে।

এদিকে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ড. আ ন ম বজলুর রশীদ জানিয়েছেন, অনুসন্ধান কার্যক্রমে সব ধরনের সহযোগিতা করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও করা হবে।

সংশ্লিষ্ট আর্থিক নথি যাচাই ও অনুসন্ধান শেষ হলে করোনাকালীন ব্যয়ের প্রকৃত হিসাব এবং উত্থাপিত অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।