পাবনার সাঁথিয়া ভুল পরিকল্পনায় আট কোটি টাকার পানি শোধনাগার বিকল

সারাদেশ

প্রায় ৮ কোটি টাকার শোধনাগার তিন মাসেই বিকল, পাঁচ বছর ধরে আয়রনযুক্ত পানি পাচ্ছেন সাঁথিয়াবাসী

ভূগর্ভস্থ পানির ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ও রোগজীবাণু দূর করে সাঁথিয়া পৌরবাসীর ঘরে ঘরে সুপেয় পানি পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই নির্মাণ করা হয়েছিল পানি শোধনাগার। কিন্তু অপরিকল্পিত উদ্যোগ, নকশাগত ত্রুটি ও যথাযথ তদারকির অভাবে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত কেন্দ্রটি এখন কার্যত অকেজো।

পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের মাত্র তিন মাসের মাথায় বন্ধ হয়ে যাওয়া শোধনাগারটি প্রায় পাঁচ বছর ধরে বিকল পড়ে রয়েছে। ফলে বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থের অপচয়ের পাশাপাশি নিয়মিত পানির বিল দিয়েও আয়রনযুক্ত পানি ব্যবহার করতে হচ্ছে পৌরবাসীকে।

হস্তান্তরের তিন মাসেই বন্ধ

সাঁথিয়া পৌরসভা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর প্রায় ৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করে। প্রকল্পের আওতায় গভীর নলকূপ স্থাপন, শোধনাগার নির্মাণ এবং পাইপলাইনের মাধ্যমে সুপেয় পানি সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল।

২০২১ সালে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে সাঁথিয়া পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে হস্তান্তরের মাত্র তিন মাসের মধ্যেই কারিগরি ত্রুটি ও ধারণক্ষমতার অসামঞ্জস্যের কারণে কেন্দ্রটি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।

দীর্ঘদিন অযত্নে পড়ে থাকায় শোধনাগারের মূল্যবান যন্ত্রাংশ ও মোটরও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

চাহিদা ৮ লাখ লিটারের বেশি, ট্যাঙ্কে ধরে আড়াই লাখ

পৌরসভা সূত্র জানায়, ২৫ দশমিক ৫৩ বর্গকিলোমিটার আয়তনের সাঁথিয়া পৌরসভার ৯টি ওয়ার্ডে প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের বসবাস। বর্তমানে মাত্র ৯টি গ্রামের ১ হাজার ১৬৫টি পরিবারের প্রায় ৬ হাজার মানুষ সরকারি পানি সংযোগের আওতায় রয়েছেন।

এসব গ্রাহকের দৈনিক গড় পানির চাহিদা প্রায় ৮ লাখ ১৫ হাজার ৫০০ লিটার। অথচ শোধনাগারের রিজার্ভ বা ওভারহেড ট্যাঙ্কের ধারণক্ষমতা মাত্র ২ লাখ ৫০ হাজার লিটার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, প্রায় সাড়ে চার ঘণ্টায় ৪ লাখ লিটার পানি তুলে তা সাড়ে ছয় ঘণ্টা ধরে বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় শোধন করতে হয়। পরিশোধিত পানি রিজার্ভ ট্যাঙ্কে তুলে লাইনে ছাড়ার পর মাত্র ৪০ থেকে ৪৫ মিনিটেই তা শেষ হয়ে যায়।

ফলে অল্পসংখ্যক গ্রাহক সুপেয় পানি পেলেও অধিকাংশ পরিবার সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। চাহিদা মেটাতে পৌর কর্তৃপক্ষকে বাধ্য হয়ে কোনো ধরনের শোধন ছাড়াই পাম্পের আয়রনযুক্ত পানি সরাসরি লাইনে সরবরাহ করতে হচ্ছে।

শোধন প্রক্রিয়া চালু রাখতে বিদ্যুৎ বিল, পানি বিশুদ্ধকরণ উপকরণ ও অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি মাসে প্রায় ৪ লাখ টাকা প্রয়োজন হয়। এই ব্যয় বহন করতেও পৌর কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

বিল দিয়েও সুপেয় পানি না পাওয়ায় ক্ষোভ

নিয়মিত পানির বিল পরিশোধ করেও বিশুদ্ধ পানি না পাওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় বিদ্যালয়ের শিক্ষক শফিকুল ইসলাম রিপন বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও পৌরবাসী মৌলিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দা সজিব মাহমুদ ও গোলাম মোস্তফার অভিযোগ, সরবরাহ করা পানিতে আয়রনের পরিমাণ এত বেশি যে কিছুক্ষণ পাত্রে রেখে দিলেই লালচে আস্তরণ পড়ে যায়। তাদের ভাষ্য, ওই পানি কাপড় ধোয়া কিংবা পান করার জন্যও উপযোগী নয়।

এ অবস্থায় আয়রনযুক্ত পানি সরবরাহ করেও কেন নিয়মিত পানির বিল আদায় করা হচ্ছে—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

‘রিজার্ভ ট্যাঙ্ক পর্যাপ্ত নয়’

কারিগরি সমস্যার কথা স্বীকার করে সাঁথিয়া পৌরসভার ভারপ্রাপ্ত উপসহকারী প্রকৌশলী আবু ইসা শফিউল আলম বলেন, পর্যাপ্ত রিজার্ভ ট্যাঙ্ক না থাকা এবং শোধন প্রক্রিয়া দীর্ঘ হওয়ায় সাময়িকভাবে সরাসরি পাম্পের পানি দিয়ে চাহিদা মেটাতে হচ্ছে।

তার মতে, আরও দু-তিনটি ওভারহেড ট্যাঙ্ক নির্মাণ করা গেলে অথবা এক থেকে দেড় কিলোমিটারের মধ্যে থাকা ভালো পানির উৎস থেকে সংযোগ আনা গেলে সমস্যার সমাধান হতে পারে।

‘প্রকল্প নেওয়ার সময় পৌরসভার সঙ্গে আলোচনা হয়নি’

সাঁথিয়া পৌর প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আসিফ রায়হান বলেন, প্রকল্প গ্রহণের সময় পৌরসভার সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি এবং পানির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ চাহিদাও বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।

তিনি বলেন, প্রকল্পটি গ্রহণের সময়ই পৌরসভায় দৈনিক পানির চাহিদা ছিল প্রায় ৫ লাখ লিটার, যা বর্তমানে আরও বেড়েছে। অথচ স্থাপন করা হয়েছে মাত্র ২ লাখ ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ট্যাঙ্ক।

চাহিদা ও সক্ষমতার এই ব্যবধানের কারণেই পানি সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে বলে জানান তিনি। শোধনাগারটি পুনরায় চালুর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে বলেও জানান পৌর প্রশাসক।

রক্ষণাবেক্ষণের দায় পৌরসভার, দাবি জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলের

অন্যদিকে শোধনাগারের বর্তমান অবস্থার দায় নিতে রাজি নয় নির্মাণকারী সংস্থা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর।

উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী ফজলে রাব্বী বলেন, ছয় থেকে সাত বছর আগে শোধনাগারের নির্মাণকাজ শেষ করে পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। হস্তান্তরের পর থেকে রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পৌর কর্তৃপক্ষের। তাদের দপ্তর থেকে শুধু কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ দেওয়া হয়।

তিনি আরও জানান, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরে বর্তমানে শোধনাগার ও ট্যাঙ্কের নকশা রয়েছে। তবে পাইপলাইন কিংবা কার্যাদেশের কোনো নথি নেই।

প্রকল্প গ্রহণের সময় গ্রাহকের পানির চাহিদা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছিল কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সম্প্রতি দায়িত্ব নেওয়ায় বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য তার জানা নেই।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।