আসন্ন দুর্গাপূজা উপলক্ষে বাংলাদেশ থেকে পদ্মার ইলিশ আমদানির অনুমতি চেয়েছেন ভারতের ব্যবসায়ীরা। পূজার বাজারে সীমিত পরিমাণে হলেও ইলিশ পাঠানোর অনুমতি দিতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে চিঠি দিয়েছে ভারতের ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন।
ভাষা, সংস্কৃতি ও খাদ্যাভ্যাসের মিলের কারণে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। সেই সম্পর্ক ও খাদ্যসংস্কৃতির অন্যতম অনুষঙ্গ ইলিশ। বিশেষ করে দুর্গাপূজার সময় পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বাংলাদেশের ইলিশের চাহিদা বেড়ে যায়।
দীর্ঘদিন ধরে ইলিশ রপ্তানিতে বিধিনিষেধ থাকায় পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরার ইলিশপ্রেমীদের চাহিদা পূরণ হচ্ছে না বলে দাবি ভারতীয় ব্যবসায়ীদের। এ কারণে এবার পূজার আগেই বাংলাদেশ থেকে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি চেয়েছেন তারা।
সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও ভারতের ব্যবসায়ী সংগঠনটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পৃথকভাবে চিঠি পাঠিয়েছে।
শুধু চিঠি দিয়েই থেমে থাকেননি সংগঠনটির নেতারা। বিষয়টি নিয়ে তারা বাংলাদেশ সফর করেছেন এবং বাণিজ্যসচিবের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। পাশাপাশি কলকাতায় নিযুক্ত বাংলাদেশের ডেপুটি হাইকমিশনার মো. খালেদের সঙ্গেও আলোচনা করেছেন।
ভারতীয় ব্যবসায়ীদের দাবি, দুর্গাপূজার সময় দুই বাংলার মানুষের আবেগ ও ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের ইলিশের ব্যাপক চাহিদা থাকে। তাই পূজার আগে সীমিত পরিমাণে হলেও পদ্মার ইলিশ রপ্তানির সুযোগ চান তারা।
ইতিবাচকভাবে দেখছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, পূজা উপলক্ষে ইলিশ রপ্তানির বিষয়টি ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে কী পরিমাণ ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
বাণিজ্যসচিব আতাউর রহমান খান বলেন, ভারতীয় ব্যবসায়ীদের চিঠি পাওয়া গেছে। কী পরিমাণ ইলিশ রপ্তানি করা যেতে পারে, তা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে নির্ধারণ করা হবে।
রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি
ভারতীয় ব্যবসায়ীদের চিঠিতে বলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালের পর থেকে প্রতি বছর গড়ে পাঁচ হাজার টন ইলিশ ভারতে রপ্তানি হতো। কিন্তু ২০১২ সালের পর রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশ সরকার দুর্গাপূজা উপলক্ষে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বিশেষ অনুমতিতে ইলিশ রপ্তানির সুযোগ দিয়ে আসছে।
তবে ভারতীয় ব্যবসায়ীদের মতে, স্বল্পমেয়াদি ও সীমিত অনুমতির কারণে অনুমোদিত পরিমাণ ইলিশ অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আমদানি করা সম্ভব হয় না।
পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের পার্শ্ববর্তী রাজ্যের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের পক্ষে ইলিশ রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহারের অনুরোধও জানানো হয়েছে। তাদের দাবি, স্থায়ীভাবে ইলিশ রপ্তানির সুযোগ দেওয়া হলে দুই দেশের বাণিজ্যিক ও পারস্পরিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হবে।
চিঠিতে প্রতিবছর সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে অনুমতি দেওয়ার পরিবর্তে এবার আরও আগে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে রপ্তানিতে কঠোর সময়সীমা না রাখারও দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
অভিজ্ঞ রপ্তানিকারকদের অনুমতি দেওয়ার দাবি
ভারতীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, অতীতে অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট খাতের বাইরে থাকা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানও ইলিশ রপ্তানির অনুমতি পেয়েছে। কিন্তু তারা কার্যকরভাবে অনুমোদিত ইলিশ রপ্তানি করতে পারেনি।
এ কারণে প্রকৃত ও অভিজ্ঞ রপ্তানিকারকদের অগ্রাধিকার দিয়ে অনুমতি দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
অনুমোদনের তুলনায় রপ্তানি কম
ভারতীয় ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে দীর্ঘ বিরতির পর ভারতে ৫০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ।
২০২০ সালে ১ হাজার ৮৫০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২১ সালে ৪ হাজার ৬০০ টন অনুমোদনের বিপরীতে ভারতে যায় ১ হাজার ২০০ টন ইলিশ।
২০২২ সালে ২ হাজার ৯০০ টন রপ্তানির অনুমতি দেওয়া হলেও বাস্তবে রপ্তানি হয় ১ হাজার ৩০০ টন। ২০২৩ সালে ৩ হাজার ৯৫০ টন অনুমোদনের বিপরীতে ভারতে যায় ১ হাজার ৩০০ টন।
২০২৫ সালে ২ হাজার ৪২০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হলেও রপ্তানি হয় মাত্র ৫৭৭ টন। সর্বশেষ গত বছর ১ হাজার ২০০ টন রপ্তানির অনুমোদনের বিপরীতে ভারতে গেছে মাত্র ১৫০ টন ইলিশ।
পশ্চিমবঙ্গ ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মকসুদ বলেন, এ বছর বেশি পরিমাণ ইলিশ আমদানির বিষয়ে তারা আশাবাদী। ইতোমধ্যে চিঠি দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের বাণিজ্যসচিবের সঙ্গে বৈঠক করেছেন তারা।
তিনি বলেন, বর্তমানে রপ্তানির জন্য এক মাস সময় বেঁধে দেওয়া হয়। এই সময়ের মধ্যে অনুমোদিত সব ইলিশ আমদানি করা সম্ভব হয় না। তাই সময়সীমা তুলে দেওয়ার পাশাপাশি ইলিশ রপ্তানির নিষেধাজ্ঞাও প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন তারা।
