ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে সারাদেশে বিদ্যুৎ সংকট, পোলট্রি খামার ও মৎস্য খাতে বিপর্যয়

দেশে রেকর্ড ৩৬৭১ মেগাওয়াট লোডশেডিং

জাতীয়

দেশজুড়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে লোডশেডিং। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় গত কয়েক দিনে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। নির্দিষ্ট সময়সূচি ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ করছেন বিভিন্ন এলাকার গ্রাহকরা।

কোনো কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রায় ১২ ঘণ্টা, আবার কোথাও দিন-রাত মিলিয়ে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এর প্রভাব পড়ছে গৃহস্থালি কাজ থেকে শুরু করে কৃষি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উৎপাদন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায়।

বিদ্যুৎ সংকটে পোলট্রি খামারে মুরগি মারা যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অন্যদিকে বরফ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় উপকূলীয় এলাকায় অনেক জেলে মাছ ধরতে সাগরে যেতে পারছেন না।

লোডশেডিং ছাড়িয়েছে সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট

বিদ্যুৎ খাতের তথ্য অনুযায়ী, রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট। ওই সময়ে লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৪৩৭ মেগাওয়াট।

এর আগে বিকেল ৩টায় ১৬ হাজার ৫১ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং দাঁড়ায় ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট।

শনিবার রাত ১২টায় ১৫ হাজার ৭৩৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬০৮ মেগাওয়াট। রোববার দুপুর ১২টায় একই পরিমাণ চাহিদার বিপরীতে লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৩১২ মেগাওয়াট।

অভ্যন্তরীণ সূত্রের বরাতে দাবি করা হচ্ছে, কোনো কোনো সময়ে প্রকৃত বিদ্যুৎ ঘাটতি চার হাজার মেগাওয়াটও ছাড়িয়েছে।

কেন এত বড় বিদ্যুৎ সংকট?

বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে কয়েকটি কারণের কথা বলছেন বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়া।

আগে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য দৈনিক প্রায় ৯৯ থেকে ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে তা প্রায় ৬৮ কোটি ঘনফুটে নেমেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য।

ফলে গ্যাসচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। গ্যাস থেকে আগে যেখানে পাঁচ থেকে ছয় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যেত, বর্তমানে গড়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার মেগাওয়াট পাওয়া যাচ্ছে।

এর পাশাপাশি পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বন্ধ থাকা এবং ভারত থেকে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার বিষয়টিও ঘাটতি বাড়িয়েছে।

৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ নেই, মারা গেল ৪ শতাধিক মুরগি

লোডশেডিংয়ের সরাসরি প্রভাব পড়েছে পোলট্রি খাতে।

যশোরের অভয়নগরের নওয়াপাড়া পৌরসভার বুইকরা গ্রামের একটি খামারে প্রায় আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় চার শতাধিক মুরগি মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

খামারসংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় খামারের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি। এতে মুরগিগুলো মারা যায়।

বরফের সংকটে সাগরে যেতে পারছেন না জেলেরা

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় বিদ্যুৎ সংকটের আরেক ধরনের প্রভাব দেখা দিয়েছে। আলীপুর-মহিপুর মৎস্যবন্দরে লোডশেডিংয়ের কারণে বরফ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

ফলে ১৫০ টাকার এক ক্যান বরফ ৩০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। বাড়তি দাম দিয়েও পর্যাপ্ত বরফ পাওয়া যাচ্ছে না।

বরফের অপেক্ষায় ঘাটে শত শত মাছধরা ট্রলার নোঙর করে থাকার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ইলিশের মৌসুমে এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।

কোথাও ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় কৃষক, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীরা সমস্যায় পড়ছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো কোনো এলাকায় দিনে প্রায় ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না।

সুনামগঞ্জের গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। সেখানে দিন-রাত মিলিয়ে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ করছেন গ্রাহকরা।

কুড়িগ্রামেও নির্দিষ্ট সময়সূচি ছাড়াই দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যবসায়িক উৎপাদন ও দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

হাসপাতাল-ক্লিনিকেও প্রভাব

রংপুরে দিন ও রাতে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সেবাও ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গরমের মধ্যে শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগ বেড়েছে।

সিলেটেও জাতীয় গ্রিড থেকে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। শনিবার সেখানে ২২৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ছিল ১৮১ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ৪৩ মেগাওয়াট।

নারায়ণগঞ্জের বন্দরেও ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আবুল কালাম দাবি করেছেন, কোনো কোনো সময়ে ঘণ্টায় তিন থেকে চারবার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।

গ্যাসের ঘাটতিও কাটেনি

মহেশখালীর ক্ষতিগ্রস্ত এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি সচল না হওয়ায় গ্যাস সরবরাহেও চাপ রয়েছে।

দুর্ঘটনার আগে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। ২১ জুলাই মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর তা কমে প্রায় ২১২ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে।

বর্তমানে সরবরাহ বেড়ে প্রায় ২৩৫ কোটি ঘনফুট হলেও দৈনিক প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট চাহিদার তুলনায় তা এখনও অনেক কম।

টার্মিনালের দ্বিতীয় বয়লার চালু হলে আরও প্রায় ৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।