কানাডার সঙ্গে চলমান বাণিজ্য উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সীমান্তবর্তী লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তন করে ‘লেক আমেরিকা’ করার নির্বাহী আদেশে সই করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে এ সংক্রান্ত নির্বাহী আদেশে সই করেন তিনি। তবে নাম পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্ত মূলত যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের ব্যবহারের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে। কানাডা বা অন্য কোনো দেশকে একই নাম ব্যবহারে বাধ্য করার এখতিয়ার যুক্তরাষ্ট্রের নেই।
৩০ দিনের মধ্যে সরকারি নথিতে পরিবর্তনের নির্দেশ
হোয়াইট হাউসের প্রকাশিত নির্বাহী আদেশ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র দপ্তরকে দেশটির Board on Geographic Names-এর সঙ্গে সমন্বয় করে ৩০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
এর অংশ হিসেবে Geographic Names Information System বা GNIS-এ ‘Lake Ontario’ নাম পরিবর্তন করে ‘Lake America’ অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ রয়েছে। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সংস্থাগুলোর মানচিত্র, নথিপত্র ও সরকারি যোগাযোগেও নতুন নাম ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, তার দৃষ্টিতে সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে কার্যকর। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথাও জানান তিনি।
বাণিজ্য বিরোধের মধ্যেই নাম পরিবর্তন
লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত এমন সময় এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার বাণিজ্য সম্পর্ক নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক বাণিজ্য আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর কয়েক বিলিয়ন ডলারের কানাডীয় পণ্যের ওপর নতুন করে উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপের পদক্ষেপ নিয়েছে কানাডাও।
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই অভিযোগ করে আসছেন, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে অন্যায্য সুবিধা পেয়েছে। লেকটির নাম পরিবর্তনের সময়ও তিনি কানাডার বাণিজ্যনীতি নিয়ে সমালোচনা করেন।
তবে নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্তটি সরাসরি কানাডার বিরুদ্ধে নেওয়া হয়েছে—এমন দাবি থেকে কিছুটা দূরত্ব রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
কানাডার প্রত্যাখ্যান
ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের পরই এর বিরোধিতা করেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি।
তিনি বলেন, লেক অন্টারিও নামটির ইতিহাস ৪০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। কানাডায় এটি আগের নামেই পরিচিত থাকবে।
অন্টারিও প্রদেশের নেতারাও নাম পরিবর্তনের উদ্যোগের বিরোধিতা করেছেন। তাদের বক্তব্য, কানাডীয়দের কাছে এটি ভবিষ্যতেও ‘লেক অন্টারিও’ হিসেবেই পরিচিত থাকবে।
শুধু কানাডা নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের গভর্নর ক্যাথি হোকুলও নতুন নাম গ্রহণে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছেন। নিউইয়র্কই যুক্তরাষ্ট্রের একমাত্র অঙ্গরাজ্য যার সঙ্গে লেক অন্টারিওর সরাসরি সীমান্ত রয়েছে।
আন্তর্জাতিকভাবে নাম পরিবর্তন কি কার্যকর হবে?
ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকার নিজেদের সরকারি ব্যবহারে লেকটির নাম পরিবর্তন করতে পারে। তবে এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিকভাবে ‘Lake Ontario’ নাম বাতিল হয়ে যাচ্ছে না।
কানাডা, আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিভিন্ন দেশের সরকার, সংবাদমাধ্যম বা বেসরকারি মানচিত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিজেদের নীতিমালা অনুযায়ী পুরোনো বা নতুন যেকোনো নাম ব্যবহার করতে পারে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি নথিতে ‘Lake America’ ব্যবহৃত হলেও বিশ্বের অন্যান্য অংশে ‘Lake Ontario’ নামটি বহাল থাকতে পারে।
লেক অন্টারিও সম্পর্কে যা জানা যায়
লেক অন্টারিও উত্তর আমেরিকার পাঁচটি গ্রেট লেকের অন্যতম। এর উত্তরে কানাডার অন্টারিও প্রদেশ এবং দক্ষিণ ও পূর্ব দিকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য অবস্থিত।
‘Ontario’ নামটির শিকড় উত্তর আমেরিকার আদিবাসী ভাষায়। নামটির ব্যবহার বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ারও আগের।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কারণেই কানাডার নেতারা ট্রাম্পের নতুন নাম গ্রহণে আপত্তি জানিয়েছেন।
আগেও ভৌগোলিক নাম পরিবর্তন করেছেন ট্রাম্প
দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ভৌগোলিক নাম পরিবর্তনে ট্রাম্পের এটি প্রথম উদ্যোগ নয়।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ব্যবহারে ‘Gulf of Mexico’-এর নাম পরিবর্তন করে ‘Gulf of America’ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তবে মেক্সিকোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ প্রচলিত ‘Gulf of Mexico’ নাম ব্যবহার অব্যাহত রেখেছে।
লেক অন্টারিওর ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা যেতে পারে।
ওভাল অফিসে নতুন আদেশে সই করার সময় ট্রাম্প ভবিষ্যতে আটলান্টিক বা প্রশান্ত মহাসাগরের নাম পরিবর্তনের বিষয়েও মন্তব্য করেন। যদিও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের একাংশও লেক অন্টারিওর নাম পরিবর্তনের সমালোচনা করেছেন। ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতাদের কয়েকজন নির্বাহী সিদ্ধান্তটি পাল্টাতে কংগ্রেসে আইনি উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন
