কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে আমন মৌসুমের শুরুতেই সার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। সরকার নির্ধারিত মূল্যে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার না পাওয়ার অভিযোগ করছেন তারা। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে সাবডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে কেজিপ্রতি ৫ থেকে ১৩ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে সার কিনছেন।
কৃষি বিভাগের বরাদ্দের তথ্য এবং কৃষকদের অভিযোগের ভিত্তিতে করা হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সার বেশি দামে বিক্রির মাধ্যমে কৃষকদের কাছ থেকে প্রায় ১৬ কোটি টাকা অতিরিক্ত নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরকারি দামে মিলছে না প্রয়োজনীয় সার
কুমারখালীর পান্টি ইউনিয়নের বড় ভালুকা গ্রামের কৃষক সামছুল আলম পাঁচ বিঘা জমিতে আমন ধানের আবাদ করেছেন। তার অভিযোগ, সম্প্রতি স্থানীয় বিসিআইসি ডিলারের কাছে সার কিনতে গিয়ে সরকার নির্ধারিত দামে ১০ কেজির বেশি সার পাননি।
পরে প্রয়োজন মেটাতে তিনি বেলতলী এলাকার এক সাবডিলারের কাছ থেকে বেশি দামে সার কেনেন। সেখানে প্রতি কেজি ইউরিয়া ৩২ টাকা, ডিএপি ৩৭ টাকা এবং টিএসপি ৩৮ টাকায় বিক্রি করা হয় বলে তার অভিযোগ। অথচ সরকারি নির্ধারিত দাম যথাক্রমে ইউরিয়া ২৭ টাকা, ডিএপি ২১ টাকা এবং টিএসপি ২৭ টাকা।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন বড় ভালুকা গ্রামের কৃষক জনি মোল্লা। ছয় বিঘা জমিতে ধান চাষ করা এই কৃষকের দাবি, ডিলারের কাছ থেকে একবারে মাত্র ১৫ থেকে ২০ কেজি সার দেওয়া হচ্ছে। ফলে প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে তাকে বারবার যেতে হচ্ছে।
শেষ পর্যন্ত তিনি খোলা বাজার থেকে ইউরিয়া ৩২ টাকা, টিএসপি ৪০ টাকা এবং ডিএপি ৩২ টাকা কেজি দরে কিনেছেন বলে জানান।
কুমারখালীতে ৩০ ডিলার, সাবডিলার ১০৮ জন
কুমারখালী উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় বিসিআইসির অনুমোদিত ডিলার রয়েছেন ১৩ জন। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) ডিলার রয়েছেন আরও ১৭ জন।
এদের অধীনে মোট ১০৮ জন সাবডিলার কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
কৃষকদের অভিযোগ, মূল ডিলারদের কাছ থেকে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ায় তাদের অনেকেই সাবডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন। আর সেখানেই দিতে হচ্ছে বাড়তি মূল্য।
সারের বরাদ্দ কত ছিল
উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর কুমারখালীতে প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল—
- ইউরিয়া: ১০ হাজার ৮৩৮ মেট্রিক টন
- টিএসপি: ২ হাজার ৭৩৮ মেট্রিক টন
- ডিএপি: ৪ হাজার ৯৮৫ মেট্রিক টন
- এমওপি: ৩ হাজার ১৫৪ মেট্রিক টন
কৃষকদের অভিযোগ অনুযায়ী কেজিপ্রতি অতিরিক্ত দামের সঙ্গে পুরো বরাদ্দের পরিমাণ হিসাব করলে অতিরিক্ত অর্থের অঙ্ক প্রায় ১৬ কোটি টাকায় দাঁড়ায়।
টিএসপিতে কেজিপ্রতি ১৩ টাকা বেশি ধরলে অতিরিক্ত অর্থের পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা। ডিএপিতে কেজিপ্রতি ১১ টাকা হিসাবে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি, এমওপিতে পাঁচ টাকা হিসাবে প্রায় দেড় কোটি এবং ইউরিয়ায় পাঁচ টাকা হিসাবে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি টাকা অতিরিক্ত আদায়ের হিসাব পাওয়া যায়।
তবে এই হিসাবটি কৃষকদের অভিযোগ ও বরাদ্দের মোট পরিমাণের ভিত্তিতে করা আনুমানিক হিসাব; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে প্রকৃত চিত্র ভিন্ন হতে পারে।
আমন মৌসুমে বেড়েছে সারের চাহিদা
বর্তমানে কুমারখালীর যদুবয়রা, পান্টি, বাগুলাট, চাঁদপুর, সদকী, শিলাইদহ ও চাপড়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় আমনের জমি প্রস্তুত ও চারা রোপণের কাজ চলছে।
মৌসুমের শুরুতেই বেড়েছে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি সারের চাহিদা। কৃষকদের অভিযোগ, এই সুযোগে একটি অসাধু চক্র কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি দামে সার বিক্রি করছে।
বিভিন্ন এলাকায় কৃষকেরা সরকার নির্ধারিত মূল্যে চাহিদামতো সার না পেয়ে সাবডিলার কিংবা খুচরা বাজারে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন।
টিএসপি ৪২, ডিএপি ৩৫ টাকা পর্যন্ত
পান্টি ইউনিয়নের জোতভালুকা গ্রামের কৃষক মজনু শেখের অভিযোগ, তিনি ইউরিয়া প্রতি কেজি ৩২ টাকা এবং টিএসপি ৪২ টাকা দরে কিনেছেন।
স্থানীয় কৃষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন এলাকায় প্রতি কেজি টিএসপি ৩৮ থেকে ৪২ টাকা, ইউরিয়া ৩০ থেকে ৩২ টাকা, ডিএপি ৩২ থেকে ৩৫ টাকা এবং এমওপি ২৫ থেকে ২৮ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।
সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় এসব মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
ডিলারের বক্তব্য: সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করতেই কম দেওয়া হচ্ছে
পান্টি ইউনিয়নের বিসিআইসি ডিলার মেসার্স পলাশ এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী জাবিউল্লাহ পলাশ কৃষকদের কম পরিমাণে সার দেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।
তার দাবি, কৃষকদের মধ্যে সারের ব্যবহার বাড়ছে। সুষম সার ব্যবহারে উৎসাহিত করা এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহার ঠেকানোর জন্যই একবারে কম পরিমাণ সার দেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে বেলতলা এলাকার সাবডিলার মেসার্স ওয়াকিল এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক ওয়াকিল আহমেদ অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন। তবে বস্তাপ্রতি ১০০ টাকা বেশি নেওয়ার কথা স্বীকার করে তিনি দাবি করেন, অন্য এলাকার কৃষকের ক্ষেত্রে এমনটি হতে পারে।
লাইসেন্স ছাড়াই সার বিক্রির অভিযোগ
যদুবয়রা ইউনিয়নের দক্ষিণ ভবানীপুর গ্রামের কৃষক রবিউল ইসলামের অভিযোগ, গত ২ আগস্ট স্থানীয় এক দোকান থেকে তাকে ইউরিয়া ৩২ টাকা, এমওপি ২৫ টাকা এবং ডিএপি ৪৫ টাকা কেজি দরে কিনতে হয়েছে।
ওই দোকানের ব্যবসায়ী আবিদ হাসানের সার বিক্রির লাইসেন্স নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে আবিদ হাসান দাবি করেছেন, নিজের জমির জন্য বিভিন্ন ডিলারের কাছ থেকে কয়েক বস্তা সার কিনে দোকানে রাখলেও তিনি কৃষকদের কাছে সার বিক্রি করেন না।
পান্টি এলাকার আরেক ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধেও লাইসেন্স ছাড়া সার বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। তিনি এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
‘কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে অভিযান প্রয়োজন’
চাপড়া ইউনিয়নের কৃষি উদ্যোক্তা মনিরুল ইসলাম অসাধু ডিলার ও কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তার মতে, সাবডিলারদের কার্যক্রম নিয়মিত পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি বেশি দামে সার বিক্রি ও অবৈধ মজুতের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা প্রয়োজন।
আলাউদ্দিন নগর বাহার কৃষি কলেজের অধ্যক্ষ নুর-ই-আলম মনে করেন, আমন মৌসুমের শুরুতে সারের সংকট দীর্ঘায়িত হলে ধানের উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
কুমারখালী দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক হাবীব চৌহানও সার সরবরাহে অনিয়মের অভিযোগ তুলে এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
কৃষি কর্মকর্তার আশ্বাস, মাঠে থাকবেন কর্মকর্তারা
কুমারখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন জানিয়েছেন, কৃষকদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারা কয়েকটি ডিলার পয়েন্টে উপস্থিত থেকে সার বিতরণ তদারকি করবেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো সিন্ডিকেট বা অসাধু ডিলারের বিরুদ্ধে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইউএনও বললেন, দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে
কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফারজানা আখতার জানিয়েছেন, সারের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও বেশি দাম নেওয়ার বিষয়ে তিনি মৌখিক অভিযোগ পেয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত লিখিত অভিযোগ পাননি।
কৃষকেরা যেন সরকার নির্ধারিত দামে সার পান, সেটি নিশ্চিত করতে প্রশাসন কাজ করছে বলে জানান তিনি। অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন ইউএনও।
