দেশের আট বিভাগে আলিয়া মাদ্রাসা জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছে সরকার। বিভাগীয় পর্যায়ে সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় এ উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একাধিক সভায় বিভাগীয় পর্যায়ে আলিয়া মাদ্রাসা জাতীয়করণের বিষয়টি নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ উদ্যোগকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন এবং এর প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছেন।
এ বিষয়ে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘জেলায় জেলায় সরকারি স্কুল-কলেজ রয়েছে, কিন্তু সরকারি মাদ্রাসা মাত্র তিনটি। এ সংখ্যাটি খুবই নগণ্য। শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে একাধিক সভায় মাদ্রাসা সরকারিকরণের বিষয়টি উঠে এসেছে। আশা করছি, এ সরকারের আমলে ভালো কিছু হবে।’
দেশে সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা মাত্র তিনটি
বর্তমানে দেশে সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা রয়েছে মাত্র তিনটি। এগুলো হলো ঢাকার সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়া, সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা এবং সরকারি মুস্তাফাবিয়া আলিয়া মাদ্রাসা।
ঢাকার সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়া ১৭৮০ সালে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে প্রতিষ্ঠানটি কলকাতা থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬১ সালে রাজধানীর বকশীবাজারে স্থায়ী ক্যাম্পাসে এর কার্যক্রম শুরু হয়।
অন্যদিকে, সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা ১৯১৩ সালে আসাম সরকারের শিক্ষামন্ত্রী খান বাহাদুর সৈয়দ আব্দুল মজিদের উদ্যোগে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসার অধীনে সিলেট শহরের চৌহাট্টায় সিনিয়র মাদ্রাসা হিসেবে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৩৩ সালে প্রতিষ্ঠানটি নিউ স্কিমের অধীনে উচ্চ মাদ্রাসায় রূপান্তরিত হয় এবং ১৯৩৫ সালে কামিল হাদিসের স্বীকৃতি লাভ করে। এটি বাংলাদেশের আলিয়া মাদ্রাসা ধারার প্রথম কামিল মাদ্রাসা।
এ ছাড়া সরকারি মুস্তাফাবিয়া আলিয়া মাদ্রাসা ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠানটিকে সরকারিকরণ করা হয়।
সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তুলনায় মাদ্রাসার সংখ্যা সীমিত
দেশে সরকারি স্কুল-কলেজের বিস্তৃত উপস্থিতি থাকলেও সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার সংখ্যা মাত্র তিনটি।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৬৫ হাজার ৫৬৯টি এবং সরকারি কলেজের সংখ্যা ৭০৮টি। এ ছাড়া বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুযায়ী, দেশে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৬৯৪টি। এমপিওভুক্ত বেসরকারি স্কুল ও কলেজের সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার।
অন্যদিকে, দেশে বেসরকারি এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা রয়েছে ৮ হাজার ২২৯টি। এর মধ্যে দাখিল পর্যায়ের মাদ্রাসা ৫ হাজার ৭৬৭টি, আলিম পর্যায়ের ১ হাজার ২৮৫টি, ফাজিল পর্যায়ের ৯৯৩টি এবং কামিল পর্যায়ের মাদ্রাসা ১৮৪টি।
এ ছাড়া দেশে স্বতন্ত্র ইবতেদায়ি মাদ্রাসা রয়েছে ১ হাজার ২৫৮টি।
বিভাগীয় পর্যায়ে মাদ্রাসা জাতীয়করণের প্রয়োজনীয়তা
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি স্কুল-কলেজ থাকলেও সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। ফলে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তাদের মতে, প্রাথমিকভাবে দেশের প্রতিটি বিভাগে অন্তত একটি করে আলিয়া মাদ্রাসা জাতীয়করণ করা প্রয়োজন। এতে বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা সরকারি ব্যবস্থাপনায় মাদ্রাসা শিক্ষার সুযোগ পাবেন।
সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যেও আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষায় নিজেদের অবস্থান তৈরি করছেন। বেসরকারি মাদ্রাসা থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ভর্তির সুযোগ পাচ্ছেন।
তাদের মতে, সময়ের চাহিদা ও শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মাদ্রাসা জাতীয়করণের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারি স্কুল ও কলেজ থাকলেও সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার সংখ্যা তিনটিতে সীমাবদ্ধ। বিভাগীয় পর্যায়ে সরকারি আলিয়া মাদ্রাসার সংখ্যা বাড়ানো হলে বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় মাদ্রাসা শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হতে পারে।
জাতীয়করণ হলে শিক্ষার মান বাড়বে: মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান
মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খোন্দকার মোহাম্মদ সাদেকুর রহমান দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে বলেন, ‘সাধারণের তুলনায় মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা তুলনামূলকভাবে বেশি নম্বরে পড়াশোনা করছে। তারা কঠোর পরিশ্রম করে উচ্চশিক্ষায় নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছে। তাই মাদ্রাসা জাতীয়করণ হলে শিক্ষার্থীরা যেমন কম খরচে পড়তেও পারবে, পাশাপাশি শিক্ষার মানও বাড়বে।’
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, বিভাগীয় পর্যায়ে আলিয়া মাদ্রাসা জাতীয়করণের উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সরকারি মাদ্রাসা শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হবে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা এর সুফল পাবেন।
